সময় ডেস্ক :: বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে অবস্থিত সাতক্ষীরা জেলা কেবল সুন্দরবনের প্রবেশদ্বারই নয়, বরং এটি প্রাকৃতিক সম্পদ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অনন্য আধার। আমরা দীর্ঘকাল ধরে এই জেলাকে ‘সাদা সোনা’ বা চিংড়ির ঘেরের জন্য চিনেছি।
কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে পর্যটন শিল্পকে যদি সাতক্ষীরার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দাঁড় করানো যায়, তবে এটি কেবল একটি জেলা নয়, বরং পুরো দেশের অর্থনীতির জন্য ‘গেম চেঞ্জার’ হতে পারে। পর্যটন এখানে কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং হতে পারে কয়েক লক্ষ মানুষের আত্মকর্মসংস্থানের টেকসই ভিত্তি।
সাতক্ষীরাকে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আমাদের প্রথাগত চিন্তার বাইরে ‘ব্যতিক্রমী’ ও ‘টেকসই’ কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
১. ঘের-পর্যটন বা ব্লু-এগ্রো ট্যুরিজম: সাতক্ষীরার হাজার হাজার হেক্টর মৎস্য ঘেরকে আমরা পর্যটনের আওতায় আনতে পারি। ঘেরের আইলে পরিকল্পিতভাবে নারিকেল ও সুপারি গাছ লাগিয়ে এবং পানির ওপর বাঁশ ও খড়ের তৈরি ‘ইকো-কটেজ’ নির্মাণ করে পর্যটকদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা তৈরি করা সম্ভব। এতে ঘেরের মালিকরা মাছ বিক্রির পাশাপাশি পর্যটন থেকেও আয় করতে পারবেন। এটি হবে ‘এগ্রো-ট্যুরিজম’ বা কৃষি-পর্যটনের এক চমৎকার উদাহরণ।
২. কমিউনিটি বেসড ট্যুরিজম (CBT) ও আত্মকর্মসংস্থান: পর্যটনের সুফল যখন সরাসরি স্থানীয় মানুষের কাছে পৌঁছায়, তখন তাকে বলা হয় কমিউনিটি বেসড ট্যুরিজম। মুন্সিগঞ্জ বা শ্যামনগর এলাকায় বনজীবী, মৌয়াল ও মুন্ডা আদিবাসীদের জীবনযাত্রা পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। যদি স্থানীয় পর্যায়ে ‘হোম-স্টে’ সুবিধা চালু করা যায়, তবে গ্রামের সাধারণ মানুষ তাদের ঘরে পর্যটক রেখে আয় করতে পারবেন। এতে গাইডের কাজ, রান্নার কাজ এবং পরিবহনে যুক্ত হয়ে স্থানীয় যুবকদের ব্যাপক কর্মসংস্থান হবে।
৩. ধর্মীয় ও প্রত্নতাত্ত্বিক সার্কিট ট্যুরিজম: যশোরেশ্বরী শক্তিপীঠ মন্দির, ঈশ্বরীপুরের হাম্মামখানা, কিংবা সুন্দরবনের কালু-রাই খাঁ’র ইতিহাস এই সবগুলোকে একটি ‘ট্যুরিজম সার্কিট’-এর আওতায় আনা প্রয়োজন। এই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোকে ঘিরে ছোট ছোট কফি শপ, হস্তশিল্পের দোকান এবং ডিজিটাল গাইড সেবা চালু করে শিক্ষিত বেকার যুবকদের দক্ষ উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
৪. কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষ জনবল তৈরি: পর্যটন শিল্পের মূল ভিত্তি হলো ‘হসপিটালিটি’। আমাদের সাতক্ষীরা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে পর্যটন ও হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টে ডিগ্রিপ্রাপ্ত তরুণদের যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট এবং ট্যুর অপারেটর হিসেবে দক্ষ জনবল তৈরি করতে পারলে এই সেক্টরে কর্মসংস্থানের কোনো অভাব হবে না। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে যদি স্বল্পমেয়াদী ইন্টার্নশিপ বা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়, তবে তরুণরা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে।
৫. রিভারাইন ট্যুরিজম ও ভাসমান বাজার: কপোতাক্ষ, খোলপেটুয়া কিংবা কালিন্দী নদীকে কেন্দ্র করে ‘রিভারাইন ট্যুরিজম’ বা নদী-পর্যটন শুরু করা যেতে পারে। সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে নদীতে ‘হাউস বোট’ পরিচালনা করলে পর্যটকরা থাইল্যান্ড বা ভিয়েতনামের মতো অভিজ্ঞতা পাবে। এটি কেবল নৌ-চালকদের আয় বাড়াবে না, বরং নদীকেন্দ্রিক ছোট ছোট বাজার ও রেস্তোরাঁ তৈরিতে ভূমিকা রাখবে।
পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন মানে কেবল রাস্তাঘাট নির্মাণ নয়, বরং এটি একটি জীবনব্যবস্থার পরিবর্তন। সাতক্ষীরাকে যদি একটি আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন হাব হিসেবে ব্র্যান্ডিং করা যায়, তবে এখানকার সাধারণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নত হবে। মধু উৎপাদনকারী থেকে শুরু করে হস্তশিল্পের কারিগর, শিক্ষিত যুবক থেকে শুরু করে সাধারণ মাঝি সবাই এই শিল্পের অংশীদার হতে পারবেন। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত পর্যটনের মাধ্যমে সাতক্ষীরার ঘরে ঘরে উদ্যোক্তা তৈরি করা। সঠিক নীতিমালার বাস্তবায়ন আর কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটলে পর্যটনই হবে সাতক্ষীরার ভবিষ্যতের প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি।
লেখক: মোঃ মামুন হাসান ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।
















